প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ১১:৩১ এএম
ইতিহাস সাক্ষী—বিপ্লব কখনো শেষ কথা নয়, বরং এটি একটি নতুন সূচনা মাত্র। অনেক দেশে অভ্যুত্থান বা আন্দোলনের পর দেখা গেছে, শাসকের পতন হলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি। ইত্তেফাক আজকের সম্পাদকীয়তে যেমন সতর্ক করেছে—আফ্রিকার লিবিয়া, সোমালিয়া কিংবা মালি; যেখানে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সেখানেই অরাজকতা, সামরিক শাসন বা বিভক্ত গোষ্ঠীর দাপটে দেশ আজও অনিশ্চয়তার পথে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্ত না হয়, যদি জনগণের আস্থা তৈরি না হয়—তাহলে পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদলেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
অন্যদিকে নিউ এজের সম্পাদকীয় তুলে ধরেছে আরও এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা—enforced disappearances বা গুম। এটি কেবল একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নয়, বরং বৈশ্বিক ন্যায়বোধের চ্যালেঞ্জ। যখন কোনো রাষ্ট্রে মানুষ অদৃশ্য হয়, পরিবার হারায় প্রিয়জন, শিশু হারায় অভিভাবক—তখন আসলে সমগ্র সমাজ ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বহুবার এই ইস্যুতে সমালোচিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি সত্যিই এমন এক গণতন্ত্র চাই, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা থাকবে না, ভয়ের ছায়ায় ঢেকে থাকবে রাষ্ট্র?
এখানেই আমাদের শিক্ষা নেওয়ার জায়গা। বিপ্লব-পরবর্তী গণতন্ত্র শুধু স্লোগান নয়—এটি বাস্তব জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। একটি স্বাধীন দেশ টিকে থাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন ও জনগণের আস্থার ওপর। শুধু নির্বাচন নয়; বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গণতন্ত্র থেকে আমরা কেবল নামটুকুই ধার করব, বাস্তবে থাকবে একই দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট—তারা শুধু সরকার বদল নয়, চায় শাসনব্যবস্থার আমূল সংস্কার। স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি ছাড়া এই দাবি পূর্ণ হবে না। তাই এখনই সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ ভুলে জনগণের জন্য একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় একত্রিত হওয়ার। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া নয়; এটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, শাসনে মানবিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিক দৃঢ়তার নাম।
আমাদের অতীত ভুলে গেলে চলবে না। গুম, নির্যাতন, কালো আইন—এসব থেকে মুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ার জন্য সবার আগে প্রয়োজন সৎ রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। পৃথিবী ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে—যে বিপ্লব জনগণের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই বিপ্লব ইতিহাসে ভেসে যায় হতাশার প্রতীকে। আর যে বিপ্লব শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জনআস্থার ভিত গড়ে তোলে, সেটিই হয়ে ওঠে প্রকৃত মুক্তির প্রতীক।
বাংলাদেশের জন্য সেই পথই আজ একমাত্র পথ—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, যেখানে ভিন্ন মতকে জায়গা দেওয়া হবে, যেখানে ন্যায়বিচার অচলাবস্থাকে ভাঙবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ বাঁচবে নিরাপদে। ইতিহাস আমাদের সামনে শিক্ষা রেখেছে; এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—আমরা কি আবারও ভুলের পুনরাবৃত্তি করব, নাকি এবার সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব?